উচ্চমাত্রার হাঁপানি চিকিৎসার একটি কার্যকর পদ্ধতি ব্রোঙ্কিয়াল থার্মোপস্নাস্টি

0
655

সম্প্রতি ভারতজুড়ে পরিচালিত একটি জরিপে দেখা যায়, সে দেশে হাঁপানি রোগীর সংখ্যা প্রায় ১৮ কোটি। গবেষণাটিতে হাঁপানির ক্রমবর্ধমান ঘটনা এবং এর চ্যালেঞ্জগুলোও তুলে ধরা হয়েছিল। গবেষণায় জানা যায়, এ রোগের ক্ষেত্রে একটি বড় উদ্বেগের কারণ হলো- এর অন্তর্নিহিত জটিল চিকিৎসাপদ্ধতি এবং রোগীদের একটি অংশ রোগটির চিকিৎসায় প্রচলিত ওষুধ গ্রহণে খুবই শীতল প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করে। দীর্ঘস্থায়ী হাঁপানিতে আক্রান্ত ব্যক্তিদের শ্বাস-প্রশ্বাস গ্রহণে মারাত্মক কষ্টের লক্ষণ অনুভূত হয় এবং এটি মারাত্মক রকম ভয়ানক অবস্থায় মৃতু্য পর্যন্ত পৌঁছতে পারে। প্রাপ্তবয়স্ক এবং শিশুদের জীবনযাত্রার মান উন্নত করতে হাঁপানি বা শ্বাস-প্রশ্বাস গ্রহণের ওপর যথাযথ নিয়ন্ত্রণ থাকা উচিত এবং এই নিয়ন্ত্রণ তাদের প্রতিদিনের কার্যকলাপকে স্বাভাবিকভাবে পরিচালিত করতে সক্ষম করে।

মারাত্মক ঝুঁকিপূর্ণ হাঁপানি বলতে আমরা কী বুঝি?

অ্যাজমা বা হাঁপানির ওষুধগুলোর সর্বোত্তম ব্যবহার সত্ত্বেও ৫ থেকে ১০ শতাংশ রোগীর হাঁপানির লক্ষণ অব্যাহত থাকে। এজাতীয় রোগীদের মারাত্মক হাঁপানি বা অ্যাজমা রোগী বলে থাকে। এটি বায়ুঘটিত একটি প্রদাহজনিত দীর্ঘস্থায়ী রোগ। মানুষের ব্রোঙ্কিয়াল মসৃণ পেশিগুলো শ্বাস-প্রশ্বাস গ্রহণের ক্ষেত্রে শ্বাসনালি রক্ষণাবেক্ষণে প্রধান ভূমিকা পালন করে। মারাত্মক হাঁপানিতে, প্রদাহঘটিত ফুলে যাওয়া এই মসৃণ পেশিগুলো এবং সেই সঙ্গে অতিরিক্ত শ্লেষ্মা শ্বাসনালিজুড়ে অবস্থান করে এবং নিশ্বাস গ্রহণ ও ত্যাগে ব্যাঘাত সৃষ্টি করে। কাশি, শ্বাস-প্রশ্বাস গ্রহণের সময় বুকে শব্দ হওয়া এবং বুক শক্ত হয়ে যাওয়ায় রোগীর শ্বাস-প্রশ্বাস গ্রহণে জটিলতা সৃষ্টি হয়। মারাত্মক হাঁপানি রোগীরা ঘন ঘন হাঁপানি আক্রান্ত হলে এটি প্রাণঘাতীও হতে পারে। হাঁপানি রোগীরা মারাত্মক এসব লক্ষণগুলোর মুখোমুখি হন যা ব্যাপক পরিমাণে ওষুধ গ্রহণের পরেও নিয়ন্ত্রণে রাখা কঠিন। যথাসময়ে অ্যাজমার নিয়ন্ত্রণ করা না গেলে জীবনমান ক্রমাগত খারাপ হতে থাকে যা রাতে ঘুম কম হওয়া, প্রতিদিনের নিয়মিত কাজে অসুবিধা এবং স্কুল বা কর্মক্ষেত্রে অনুপস্থিতি বাড়াতেই থাকে।

অ্যাজমা আক্রমণ বলতে কী বোঝায়?

কয়েক ঘণ্টা বা কয়েক দিনের ব্যবধানে হঠাৎ করে হাঁপানির রোগের লক্ষণ বৃদ্ধি পাওয়াকে হাঁপানি বা অ্যাজমা আক্রমণ বলে। হাঁপানি আক্রমণের সময়, রোগীদের শ্বাসনালিগুলোয় প্রচন্ড বাঁধার সৃষ্টি হয় যা ইনহেলার দ্বারাও কার্যকর করে তোলা যায় না। এটি প্রাণঘাতী জরুরি অবস্থা হিসেবে পরিণত হতে পারে। যখন ইনহেলার ব্যবহার সত্ত্বেও (৬-৮ পাফ) লক্ষণগুলো অব্যাহত থাকে, রোগীদের অবিলম্বে জরুরি অবস্থার জন্য যোগাযোগের পরামর্শ দেওয়া হয়। যাদের হাঁপানি নেই হাঁপানিতে আক্রান্ত লোকেরা সাধারণত তাদের চেয়ে শ্বাসতন্ত্রে অতিরিক্ত মসৃণ পেশি টিসু্য ধারণ করে থাকে। হাঁপানির আক্রমণ হলে এই অতিরিক্ত টিসু্যগুলো শ্বাসনালিতে বাঁধার সৃষ্টি করে যা নিশ্বাসকে কষ্টকর করে তোলে। হাঁপানির ওষুধগুলো শ্বাসতন্ত্রে সৃষ্ট এই বাঁধাগুলো খুলতে সহায়তা করে, যদিও তীব্র হাঁপানির লোকদের ক্ষেত্রে এই ওষুধগুলো সবসময় ভালো কাজ করে না।

ব্রোঙ্কিয়াল থার্মোপস্নাস্ট কী?

ব্রোঙ্কিয়াল থার্মোপস্নাস্ট (বিটি) একটি ব্রোঙ্কোস্কোপিক পদ্ধতি যা চিকিৎসায় ভালো হয় না এমন হাঁপানির ক্ষেত্রে আশা জাগিয়ে তুলছে। এটি নিরাপদ, নূ্যনতম ক্ষতিকর একটি প্রক্রিয়া যার লক্ষ্য সংকীর্ণ শ্বাসতন্ত্রকে উন্মুক্ত করা এবং শ্বাস-প্রশ্বাসপ্রবাহকে সহজতর করা। এটি রেডিও-ফ্রিকোয়েন্সি পালস প্রয়োগ করার মাধ্যমে শ্বাসনালির মসৃণ পেশিগুলোর পুরো ত্বকে হ্রাস করে। প্রক্রিয়া চলাকালে, চিকিৎসক রোগীর মুখ বা নাকের মাধ্যমে ব্রেঙ্কোস্কোপ সন্নিবেশ করান। এটি একটি পাতলা, নমনীয় নল যার শেষে একটি ছোট ক্যামেরা থাকে। একবার টিউবটি স্থাপন করা হয়ে গেলে, তিনি টিউবটির মাধ্যমে একটি বিশেষ তার প্রবেশ করান এবং তারপর নির্দিষ্টভাবে নিয়ন্ত্রিত রেডিও-ফ্রিকোয়েন্সির পালস প্রয়োগ করেন। এই পালসগুলো এমন তাপ উৎপাদন করে যা মসৃণ পেশিগুলোর বেধ কমানোর জন্য পর্যাপ্ত যাতে শ্বাসনালিগুলো অবারিত হয়। ব্রোঙ্কিয়াল থার্মোপস্নাস্ট ৩ সপ্তাহের ব্যবধানে নির্ধারিত ৩ পৃথক সেশনে মাঝারি ধরনের সংক্ষেপণের অধীনে সঞ্চালিত হয়। প্রতিটি সেশন প্রায় এক ঘণ্টা স্থায়ী হয় এবং সব আক্রান্ত স্থানগুলোকে আচ্ছাদিত করে শ্বাস-প্রশ্বাস নিশ্চিত করার জন্য ফুসফুসের বিভিন্ন অঞ্চলে মনোনিবেশ করে। নিয়োজিত অ্যাজমা বিশেষজ্ঞ (পালমোনোলজিস্ট) প্রথম, দ্বিতীয় এবং তৃতীয় সেশনে যথাক্রমে রোগীর শ্বাসতন্ত্রের ডানদিকের নিচের লোব, বামদিকের নিচের লোব এবং উভয় পাশের উপরের লোবগুলোর উপর এই চিকিৎসাপদ্ধতি প্রয়োগ করে থাকেন। এই পদ্ধতি নিরাপদ এবং সর্বোচ্চ ফলাফল নিশ্চিত করে।

ব্রোঙ্কিয়াল থার্মোপস্নাস্টির সুবিধা এবং ঝুঁকিগুলো কী কী?

এখনো পর্যন্ত হাঁপানির চিকিৎসা নির্ধারণে রোগের প্রদাহজনিত প্রতিক্রিয়া যা হাঁপানি আক্রমণের একটি অন্তর্নিহিত কারণ তা লক্ষ্য করে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হচ্ছে। ব্রোঙ্কিয়াল থার্মোপস্নাস্টি সম্পূর্ণ শ্বাসনালির পরিবর্তে শ্বাসনালির মসৃণ পেশিগুলোকে লক্ষ্য করে হাঁপানির চিকিৎসায় একটি নতুন দিগন্তের সূচনা করেছে। ব্রোঙ্কিয়াল থার্মোপস্নাস্টি বা বিটি শ্বাসনালির পেশিগুলোকে প্রশস্ত ও উন্মুক্ত করে শ্বাস-প্রশ্বাসকে স্বাভাবিক করে তোলে। এমনকি যেসব রোগীর ক্ষেত্রে ওষুধ কার্যকারিত হারিয়েছে বিটি তাদের ক্ষেত্রেও শ্বাসনালিকে কার্যকর করে তোলে এবং শ্বাসকষ্টের লক্ষণ অবদমিত করে হাঁপানি নির্মূলে সহায়তা করে থাকে। যে কোনো প্রক্রিয়া হিসাবে, ব্রোঙ্কিয়াল থার্মোপস্নাস্টি কয়েকটি পার্শ্ব-প্রতিক্রিয়া ও ঝুঁকি বহন করে। সর্বাধিক সাধারণ পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া হলো শ্বাসকষ্টের লক্ষণগুলোর অস্থায়ী অবনতি। আদর্শভাবে, সঠিক যত্নসহকারে চিকিৎসা করার পরে এই লক্ষণগুলো এক সপ্তাহের মধ্যে সমাধান হয়ে যায়। তাৎক্ষণিক চিকিৎসা এবং কার্যকর পরিকল্পনা দেওয়ার জন্য পালমোনোলজিস্ট রোগীকে সার্বক্ষণিক পর্যবেক্ষণ করবেন।

ব্রোঙ্কিয়াল থার্মোপস্নাস্টির সাফল্যের হার কত?

মারাত্মক হাঁপানি রোগীদের ক্ষেত্রে বিটির ৫ বছরের সাফল্যের হার ক্লিনিকেলি প্রমাণিত হয়েছে। ব্রোঙ্কিয়াল থার্মোপস্নাস্টির সম্পূর্ণ নিরাময়যোগ্য চিকিৎসা নয়, রোগীকে তারপরও কয়েকটি ইনহেলার ওষুধ ব্যবহার করতে হতে পারে। তবে বিটি ওষুধের মাত্রা এবং রিলিভার ইনহেলারের প্রয়োজনীয়তা হ্রাস করতে সহায়তা করে।

চিকিৎসায় প্রমাণিত শ্বাসনালিযুক্ত (ব্রোঙ্কিয়াল) থার্মোপস্নাস্টির সাফল্য নিম্নরূপ-

* এটি মারাত্মক হাঁপানির আক্রমণকে ৩২% হ্রাস করে।

* হাঁপানির সঙ্গে সম্পৃক্ত জরুরি কক্ষের পরিদর্শন ৮৪% হ্রাস করে।

* হাঁপানির কারণে কর্ম বা প্রতিদিনের ক্রিয়াকলাপ থেকে হারিয়ে যাওয়া দিনগুলো ৬৬% হ্রাস করে।

* হাঁপানি সংক্রান্ত জীবনযাত্রার মান ৭৯% উন্নত করে।

আপনি কি ব্রোঙ্কিয়াল থার্মোপস্নাস্টির সঠিক প্রার্থী?

ব্রোঙ্কিয়াল থার্মোপস্নাস্টির এমন একজনের জন্য: যার গুরুতর, অবিরাম হাঁপানি রয়েছে যা ইনহেলড কর্টিকোস্টেরয়েডস এবং দীর্ঘ-সময়কালে ব্রোঙ্কোডিলিটর ওষুধ দ্বারা নিয়ন্ত্রণে রাখা কঠিন যার রোগের বয়স ১৮ বছর বা তারও বেশি যার জীবনমানে প্রতিবন্ধকতা রয়েছে একজন অধূমপায়ী ব্রোঙ্কোস্কোপি ওষুদ গ্রহণে যার অ্যালার্জি নেই যিনি একজন অপেসমেকার, অভ্যন্তরীণ ডিফিব্রিলিটর বা অন্যান্য ইমপস্নানটেবল বৈদু্যতিক ডিভাইস যিনি শারীরিকভাবে বহন করেন না বিটি যদি আপনার জন্য সঠিক বিকল্প না হয়, তবে উপসর্গগুলো ভালোভাবে পরিচালনা করতে আপনার চিকিৎসকের সঙ্গে চিকিৎসার অন্যান্য বিকল্পগুলো সম্পর্কে আলোচনা করুন।

একটি কেস স্টাডি: যশোদা হাসপাতালে সফল ব্রোঙ্কিয়াল থার্মোপস্নাস্টি পদ্ধতিতে যাওয়ার পরে একজন ৫৩ বছর বয়সি মহিলা কীভাবে এখন স্বস্তির জীবনযাপন করছেন তার এটি একটি সফল গল্প।

আরও জানতে চান?

আপনি যদি ব্রোঙ্কিয়াল থার্মোপস্নাস্টি সম্পর্কে আরও জানতে চান তবে যশোদা হাসপাতালের অ্যাজমা বিশেষজ্ঞের সঙ্গে কথা বলুন। অ্যাজমা বিশেষজ্ঞ বা পালমোনোলজিস্ট আপনাকে চিকিৎসার আগে, চিকিৎসার সময় এবং পরে কী কী প্রত্যাশা করবেন সে সম্পর্কে গাইড করবে।
সুত্র : যায়যায়দিন

মন্তব্য দিন

Please enter your comment!
Please enter your name here