তাবলীগ জামাতে চলমান সমস্যার মূল কারণ কী?

0
937

১৯২৬ সাল। তাবলীগ জামাতের প্রতিষ্ঠাকাল। কালিমা, নামাজ, ইলম ও জিকির,ইকরামুল মুসলিমীন, সহীহ নিয়ত,তাবলীগ” এ ছয়টি মূলনীতির উপর ভিত্তি করেই জামাতটি সূচনা লাভ করে এবং বিগত প্রায় ১ শতাব্দীতে সারা বিশ্বে আলোড়ন সৃষ্টি করে। নীরব ঈমানী আন্দোলন হিসেবে স্থান করে নেয় মানুষের হ্নদয়ে। কোটি কোটি মানুষ এ জামাতের সাথে যুক্ত হয়ে নিজেকে আমূল পরিবর্তন করতে সক্ষম হয়।

ক্ষমতারমোহ মুক্ত এ হক জামাতটি হটাৎ সংকটে পতিত হয় গত কয়েক বছর আগে। জামাতের সাথে যুক্ত কোটি কোটি দীনদার এতে বিভক্ত হয়ে যান। কিন্তু কেন এই সংকট? কেন এই বিভক্তি? এ নিয়ে ধুম্রজাল ছড়িয়ে পড়ে!

সাধারণ মানুষ এখনো জানেনা যে আসল সমস্যা কী?
কেউ বলছে, এটা দুপক্ষের মধ্যে ক্ষমতা দখলের দ্বন্দ্ব।
কেউ বলছে, হেফাজতে ইসলামের আলেমদের দখলদারিত্বের চেষ্টার কারণেই এ সমস্যা।
কেউ বলছে, বিদেশী শক্তি তথা পাকিস্তানিদের ইন্ধন! আর কেউ বলছেন, এটা মাওলানা সা’দ সাহেবের আকীদাগত সমস্যা।

লোকমুখে ছড়ানো কথাগুলোর মধ্যে শেষ কথাটিই সঠিক। চলমান সমস্যাটি আকীদাগত। যা সৃষ্টি হয়েছে একান্তই ভারতের মাওলানা সা’দ কান্ধলভীর মাধ্যমে। তিনি এজামাতের শীর্ষ মুরুব্বিদের মধ্যে একজন। তিনি এজামাতের প্রতিষ্ঠাতা হজরত মাওলানা ইলিয়াস কান্ধলভী রহ.এর বংশধর।

উল্লেখ্য, গত দুই দশক যাবত এ জামাতের একক কোন আমীর নেতৃত্বে চলেনা বরং বিভিন্ন দেশের শীর্ষ মুরুব্বীদের নিয়ে একটি শুরা আছে। যার মাধ্যমে জামাত পরিচালিত হচ্ছে৷ মাওলানা সা’দ সাহেব তাদের মধ্যে একজন।

তিনি গত কয়েকবছর যাবত এ জামাতের মূল ৬ উসুল তথা নীতিমালার বাহিরে এমন কিছু বয়ান বক্তৃতা দিতে থাকেন যা আহলে সুন্নাত ওয়াল জামাতের আকীদা বিরোধী। ফলে এই উপমহাদেশের ইলমি মারকায খ্যাত দারুল উলুম দেওবন্দে তাঁর এসব বয়ান,বক্তৃতা ও আকীদার ব্যাপারে জানতে চেয়ে প্রশ্ন করা হয়।

দারুল উলুম দেওবন্দ দীর্ঘ সময় ধরে গবেষণার পর তাঁর এ বয়ান বক্তৃতা ও আকীদার ব্যাপারে সরাসরি ফাতওয়া জারী ০৫/০৩/১৪৩৮ হিজরী। মাওলানাকে এধরনের বয়ান সামনে না করতে এবংআগের বয়ান থেকে রুজু তথা ফিরে আসতে বলে৷

মাওলানা সা’দ সাহেব দারুল উলুম দেওবন্দের এ ফাতওয়ার পরিপ্রেক্ষিতে পাল্টা চিঠি লিখেন। শুরুর দিকে কিছুটা নমনীয় দেখালেও শেষ দিকে এসে আত্মপক্ষ সমর্থন করে বসেন এবং বলেন আমার বয়ান বক্তৃতা দলীল নির্ভর। সময়ের অভাবে দেখাতে না পারলেও পরে দেখানো যাবে।

দারুল উলুম দেওবন্দ মাওলানার এমন আত্মপক্ষ সমর্থনমূলক পত্র ও বক্তব্যের উপর অনাস্থা প্রকাশ করে। এবং তাকে পুরোপুরিভাবে ফিরে আসার আমন্ত্রণ জানান। এরপর বেশ কয়েকবার চিঠি আদানপ্রদান হলেও মাওলানা সা’দ সাহেব পুরোপুরি ফিরে আসেনি।

ফলে ৩১/০১/২০১৮ তারিখে দেওবন্দ থেকে চুড়ান্ত চিঠি দেয়। তাতে মাওলানা সা’দ সাহবের শুধু একটি বিষয় তথা মুসা আ. কে নিয়ে দেয়া বক্তব্যের ব্যাপারে আশ্বস্ততা প্রকাশ করলেও বাকী সমস্যাগুলোর ব্যাপারে পুর্বঅনাস্থাই বলবৎ রেখে দেওবন্দের ওয়েবসাইটে ফাতওয়া জারি করে৷

বিষয়টা বাংলাদেশসহ সারাবিশ্বেই ছড়িয়ে যায়। ফলে উলামায়ে কেরাম কাকরাইলের শুরার মুরুব্বীদেরকে এ বিষয়ে দারুল উলুম দেওবন্দের অবস্থানই সঠিক জানিয়ে মাওলানা সা’দ সাহেব পুরোপুরি ঠিক না হওয়া পর্যন্ত আমাদের দেশীয় তাবলীগের কোন কাজে যুক্ত না করতে অনুরোধ জানায়। কাকরাইলের প্রায় সব মুকীম সাথীরা তা মেনেও নেন।

কিন্তু কিছু লোক তথা ওয়াসিফুল ইসলাম, নাসিম,মোশাররফ, মাওলানা আশরাফ আলী সহ কয়েকজন তা মেনে নিতে অস্বীকৃতি করেন। ফলে আমাদের দেশে সমাধানের পথ বন্ধ হয়ে যায়,সমস্যার দ্বার উম্মুক্ত হয়। আর এ সমস্যাই সবশেষে গত ১লা ডিসেম্বরের রক্তাক্ত ট্রাজেডি সৃষ্টি করে। যা পুরো জাতিকে শোকাহত করে।

দুঃখজনক বিষয় হল,মূল সমস্যার দিকে মনোযোগ না দিয়ে আমাদের দেশীয় মিডিয়া ও সাদ সাহেবের ভক্তরা এটাকে ক্ষমতার দ্বন্দ্ব হিসেবে চালিয়ে দিয়ে সমস্যা আরও বাড়িয়ে দিচ্ছে। অথচ যার বয়ান বক্তৃতা নিয়ে সমস্যা সেই মাওলানা সা’দ সাহেব ঠিক হয়ে গেলেই এক মুহুর্তে সব ঠিক হয়ে যায়।

দোয়া করি আল্লাহ মাওলানাকে ফিরে আসার তাওফিক দান করুন।

মুফতি মুহাম্মাদ শামছুদ্দোহা আশরাফী
খতিব- সাইন্সল্যাবরেটরি কেন্দ্রীয় জামে মসজিদ ধানমন্ডি ঢাকা।
প্রিন্সিপাল ও প্রধান মুফতি- র ওজাতুল উলুম মাদরাসা, মিরপুর।
muftishamsuddoha@gmail.com

মন্তব্য দিন

Please enter your comment!
Please enter your name here