বিদায়ী বছরে ভয়াবহ আগুনে কেড়ে নেয় দেড় শতাধিক প্রাণ

0
488

বিদায়ী বছরে রাজধানী ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে বেশ কয়েকটি ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটে। চকবাজারের চুড়িহাট্টা থেকে কেরানীগঞ্জের চুনখুটিয়া ট্র্যাজেডি। মাঝখানে বনানীর বহুতল ভবন ফারুক-রূপায়ন (এফআর) টাওয়ার। ২০১৯ সালে এমন ভয়াবহ ঘটনাসহ ঢাকা ও আশপাশ এলাকার আগুনে অন্তত দেড় শতাধিক ব্যক্তির প্রাণ কেড়ে নিয়েছে। এর মধ্যে মিরপুরের রূপনগরে ও চট্টগ্রামের পাথরঘাটা এলাকায় গ্যাস সিলিন্ডার বিস্ফোরিত হয়ে শিশুসহ ১৫ জন নিহত হয়েছে। এছাড়া রাজধানীর বিভিন্ন বস্তিতে ভয়াবহ আগুনে পুড়ে ছাই হয়ে গেছে হাজারো ঘরবাড়ি। এসব আগুনে গৃহহীন হয়েছেন হাজার হাজার খেটে খাওয়া মানুষ।

২০১৯ সালের শুরুতে পুরান ঢাকার চুড়িহাট্টার অগ্নিকাণ্ড নয় বছর আগের নিমতলীর অগ্নিকাণ্ডের স্মৃতি ফিরিয়ে আনে। তার রেশ কাটতে না কাটতেই বনানীর এফআর টাওয়ার পুড়ে আগুনে। বছরের শেষে কেরানীগঞ্জে অগ্নিকাণ্ডেও ক্ষয়ক্ষতি ছিল ব্যাপক।

বিদায়ী বছরের প্রথম দিকে ২০ ফেব্রুয়ারি পুরান ঢাকার চকবাজারের চুড়িহাট্টায় ঘটে ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ড। এই আগুন পুরোপুরি নেভাতে ১৫ ঘণ্টা সময় লেগেছিল। এতে ৭১ জন প্রাণ হারান। আগুনে চকবাজার চুড়িহাট্টা শাহী মসজিদের পাশে ক্ষতিগ্রস্ত ভবনে বিভিন্ন দোকানের পাশাপাশি ছিল রাসায়নিক, প্লাস্টিক ও প্রসাধন সামগ্রীর গুদাম। দাহ্য পদার্থ থাকার কারণে আগুন দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে। অগ্নিকাণ্ডের উৎপত্তিস্থল হিসেবে যে ওয়াহেদ ম্যানশন চিহ্নিত হয়েছে, সেখানে প্লাস্টিক দানার গুদাম ছিল, ছিল রাসায়নিকও। অন্য যে চারটি ভবন ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল, সেগুলোর কোনো কোনোটিতেও ছিল দাহ্য পদার্থ।

২০১০ সালে নিমতলীর ঘটনার পর যে ১৭ দফা সুপারিশ এসেছিল, তার বাস্তবায়ন না করায় চুড়িহাট্টার অগ্নিকাণ্ডে এত ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে বলে দাবি উঠেছে। এজন্য সরকারি কর্মকর্তাদের অবহেলাকেই দায়ী করছে বিভিন্ন নাগরিক সংগঠন। চুড়িহাট্টায় অগ্নিকাণ্ডের পর পুরান ঢাকার সব রাসায়নিকের গুদাম ও কারখানা অপসারণের কাজ ফের শুরু করে সিটি কর্পোরেশন। তবে কিছু দিন যেতে না যেতেই সে কাজে নেমে আসে ভাটা।

চুড়িহাট্টা ট্র্যাজেডির ৩৬ দিনের মাথায় গত ২৮ মার্চ বড় ধরনের অগ্নিকাণ্ড ঘটে বনানীর ১৮তলা ভবন ফারুক-রূপায়ন (এফআর) টাওয়ারে। মর্মান্তিক এ ঘটনায় ২৫ জনের মৃত্যু হয়। তাদের মৃত্যু হয়েছে আগুনে পুড়ে, ধোঁয়ায় শ্বাসরোধ হয়ে; শ্রীলঙ্কার এক নাগরিকসহ কয়েকজনের মৃত্যু হয় বাঁচার চেষ্টায় লাফিয়ে পড়ে। ভয়াবহ ওই আগুন লাগার পর এফআর টাওয়ারের নকশা অনুমোদনে বিধি লঙ্ঘন ও নির্মাণের ক্ষেত্রে ত্রুটি বিচ্যুতির জন্য রাজউকের সাবেক চেয়ারম্যানসহ অর্ধশতাধিক কর্মকর্তা-কর্মচারীকে চিহ্নিত করে প্রতিবেদন প্রকাশ করে সরকার।

আর বছরের শেষ মাসে গত ১১ ডিসেম্বর কেরানীগঞ্জের চুনকুটিয়া এলাকায় প্রাইম পেট অ্যান্ড প্লাস্টিক ইন্ডাস্ট্র্রিজ লিমিটেড কারখানায় আবারো ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ড ঘটে। এতে এ পর্যন্ত মোট ২২ জনের মৃত্যু হয়। এখনো আশঙ্কাজনকভাবে হাসপাতালে ভর্তি আছেন আরো ৬ জন শ্রমিক। এ অগ্নিকাণ্ডের পর বেরিয়ে আসে কারখানাটির সরকারি কোনো অনুমোদন নেই। সেখানকার গ্যাস লাইন ও বিদ্যুৎ সংযোগও ছিল অবৈধ। এ ঘটনায় উচ্চপর্যায়ের দুটি তদন্ত কমিটি গঠিত হয়েছে।

বিদায়ী ডিসেম্বর মাসেই গাজীপুরে একটি ফ্যান কারখানায় আগুন লেগে ঘটনাস্থলেই মারা যান ১০ শ্রমিক। এর আগে গত অক্টোবর মাসের শেষে রাজধানীর মিরপুরের রূপনগরে বেলুন ফোলানোর গ্যাস সিলিন্ডার বিস্ফোরণে ৭ জনের মৃত্যু হয়। এর মধ্যে ৬ জনই শিশু। এ ঘটনায় আরো কয়েকটি শিশু দগ্ধ হয়ে গুরুতর আহত হয়। এরপর গত নভেম্বরের মধ্যমভাগে চট্টগ্রামের পাথরঘাটা এলাকায় একটি বাড়িতে গ্যাসের পাইপলাইন বিস্ফোরিত হয়ে পথচারীসহ অন্তত সাতজন নিহত হন। আহত হন আরো ১৫ জন।

এ ছাড়া ২০১৯ সালে ঢাকার মিরপুরের রূপনগর, কালশী, ভাষানটেক, কল্যাণপুর, মগবাজার ও গুলশানের কড়াইলসহ বেশ কয়েকটি বস্তিতে ভয়াবহ আগুন লাগার ঘটনা ঘটে। এসব আগুনে কয়েক হাজার কাঁচা ঘরবাড়ি পুড়ে ছাই হয়ে যায়। এতে বৃষ্টি ও শীতে হাজার হাজার শ্রমজীবী মানুষ গৃহহীন হয়ে দিশেহারা হন। কিছুক্ষেত্রে সরকারি সহায়তা দেয়া হলেও সেটি পর্যাপ্ত ছিল না বলে মনে করেন ভুক্তভোগীরা।

মন্তব্য দিন

Please enter your comment!
Please enter your name here